প্রেম পত্র

একটা ওয়ার্কশপে সংবাদ উপস্থাপনার উপর সেশন নিচ্ছেন একজন টিভি সংবাদ উপস্থাপিকা। “আপনি যখন কোনো সংবাদ পাঠ করবেন, তখন নিজের মতাদর্শ, আবেগ-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ না ঘটিয়ে সর্বস্তরের জনগণের ঐ বিষয়ে যেই অভিব্যক্তি, সেই টোনে আপনি খবর টা পড়বেন।”

একটু থেমে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, “যেমন ধরুন, হুমায়ূন আহমেদ যেদিন মারা যান, আমি খবর টা শুনে খুব খুশি হই।

কিন্তু সেদিন খবর পড়ার সময় আমার আনন্দকে প্রকাশ না করে, দেশের আর সবার মতো আমিও খুব দুঃখ ভারাক্রান্ত- এরকম একটা টোনে খবর টা পড়ি।” 

এমন উদাহরণ শুনে আমরা প্রত্যেকেই একটু নড়েচড়ে বসলাম। সবাই চোখ বড় বড় করে ওনার দিকে তাকিয়ে। বিষয়টা আঁচ করতে পেরে তিনি বললেন, “আসলে, আপনারা তো হুমায়ূন আহমেদকে চেনেন তার লেখা বইয়ের সূত্রে, লেখক হিসেবে।

আর আমি তাকে পারিবারিকভাবে চিনি। শিলা আমার কাছের বান্ধবী। ওদের বাসায় আমার নিয়মিত যাতায়াত আর আমাদের বাসায় শিলার যাতায়াত এরকম ব্যাপার টা আরকি।

তাই, হুমায়ূন আহমেদের কারণে ওদের পরিবারকে কি পরিমাণ মানসিক কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তা আমার নিজের চোখে দেখা।”

চৌদ্দ বছরের এক কিশোরী ভালোবেসেছিল একজন লেখককে। ধন সম্পদ, বয়স, ক্যারিয়ার, বংশগৌরব- কিছুই নয়, কিশোরী শুধু চেয়েছিল নন্দিত নরকের স্রষ্টাকে তার জীবনসাথী করে পেতে।

পেয়েও ছিল। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে পড়েই তার প্রেমে পড়েন গুলতেকিন। হুমায়ূন বরাবর চিঠি লিখেন। চিঠি চালাচালিতেই এগোতে থাকে সম্পর্ক।

রূপবতী গুলতেকিনের প্রেমে তখন পাগলপারা হুমায়ূন। হুমায়ূন আহমেদের মনে হল গুলতেকিন নামের এই মেয়েটিকে না পেলে তার চলবে না। কিন্তু গুলতেকিনের মা-বাবা হুমায়ূনের কাছে মেয়ের বিয়ে দেবেন না। গুলতেকিন খান বিত্তশালী পরিবারের সন্তান।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর আদরের নাতিন। কতটা উচ্চবংশীয় সামাজিক মর্যাদার পরিবার হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক ও একজন উঠতি লেখকের কাছে মেয়ে দিতে তাদের আপত্তি থাকে নিশ্চয়ই ভাবতে পারছেন।

অনেকটা পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়েই ১৯৭৩ সালের ২৮ এপ্রিল, ঠিক আজকের এই দিনে, হুট করে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয় ক্লাস টেনে পড়া গুলতেকিন আর হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদের পরিবার তখন প্রবল অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাবর রোডের যে সরকারি বাসায় তারা থাকতেন, ম্যাজিস্ট্রেট এসে সেই বাড়ি ছাড়ার নোটিস দিয়ে গেছে দিন পনেরো আগে। বিয়ের পরদিনই পুলিশ দিয়ে তাদেরকে বাসা থেকে বের করে দেবার কথা।

হুমায়ূন আহমেদের মা তাঁর সর্বশেষ সম্বল বাবার দেয়া হাতের একজোড়া বালা বিক্রি করে বিয়ের বাজার করলেন।

বোনেরা এক বাসা থেকে সিলিং ফ্যান, বেতের চেয়ার, এক বাসা থেকে ক্যাসেট প্লেয়ার, এমনকি বিছানার চাদরটা পর্যন্ত পাশের এক বাসা থেকে ধার করে এনে বাসর ঘর সাজালেন।

বউ নিয়ে বাসায় ফিরে চমকে গেলেন হুমায়ূন নিজেই। মাথার উপরে ফ্যান ঘুরছে। বিছানায় সুন্দর ভেলভেটের চাদর।

খাটের পাশে সুন্দর দুটি বেতের চেয়ার। বেতের চেয়ারের পাশে ছোট্ট একটা টেবিলে একগাদা রক্ত গোলাপ।

ক্যাসেট প্লেয়ার চালু করতেই বেজে উঠলো – 

❝ভালবেসে যদি সুখ নাহি,

তবে কেন,

তবে কেন মিছে ভালবাসা?❞

সারারাত গান শুনে কাটিয়ে দিলো দুজন।

পরদিন ভোরবেলা বাসার সামনে পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ালো। বাড়ি থেকে বের করে দেবে তাই প্রতিবেশীরা তড়িঘড়ি করে তাদের জিনিসপত্র নিতে এলো।

যাদের বাসা থেকে সিলিং ফ্যান ধার করে আনা হয়েছিল তারা ফ্যান খুলে নিয়ে গেল।

গুলতেকিন বিস্মিত হয়ে বলল, “ওরা আমাদের ফ্যান খুলে নিচ্ছে কেন?!” বিছানার চমৎকার চাদর, বেতের চেয়ার, ক্যাসেট প্লেয়ার- সবই তারা নিয়ে গেল।

এমন কি টেবিলে রাখা সুন্দর ফুলদানিও অদৃশ্য। বিত্তশালী পরিবারের গুলতেকিন রীতিমতো হতভম্ব। সে বলল, “এসব কি হচ্ছে বলুন তো? ওরা আমাদের জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে কেন? আমরা বুঝি রাতে গান শুনব না!”

কিন্তু মুগ্ধতার ব্যাপার হল, পরবর্তীতে সমস্তটা জানতে পেরেও কিশোরী ছেড়ে দেননি সেই মধ্যবিত্ত লেখকের হাত। বরং জীবনের নানা দুর্যোগ আর দূর্দিনে হাতে হাত রেখে পাড়ি দিয়েছেন কঠিন পথ।

তাদের এই সম্পর্কটিতে শুধু এক কিশোরীর আবেগী ভালোবাসাই ছিল না, ছিল না একজন লেখকের ঝোঁকের মাথায় গড়া দাম্পত্যজীবন; বরং তাদের জীবনের গল্পগুলো ছিলো অনেক বেশী ত্যাগ, বিসর্জন আর ভালোবাসার।

গুলতেকিন খুব মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু অল্প বয়সেই প্রেমে পড়ে বিয়ে করে স্বামী সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি।

স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি, স্বামীর টানাপোড়েনের সংসারে যুদ্ধ করেছেন। পাশে থেকেছেন। সংসার সামলেছেন। এক সময়ের উঠতি লেখক হুমায়ূন আহমেদকে সম্ভাবনার এক স্তর থেকে আরেক স্তরে পৌঁছে দিয়েছেন।

 তখন ধারাবাহিক নাটক ‘অয়োময়’ চলছে বিটিভিতে। গুলতেকিন এক রাতে হুমায়ূন আহমেদকে জানালেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা। হুমায়ূন যেন নাটক লেখা কিছুদিনের জন্য বন্ধ রেখে তাকে একটু সময় দেন। হূমায়ূন আহমেদ রাজি হলেন না।

পরবর্তীতে, জন্মের তিন দিনের মাথায় মারা যায় তাঁদের সেই প্রথম পুত্রসন্তান রাশেদ হুমায়ূন। সেই রাতেও লেখক তার লেখা নিয়ে ব্যস্ত। কারণ, তাকে লেখা জমা দিতে হবে।

হঠাৎ কী মনে হতে পেছন ফিরে দেখেন তার স্ত্রী জলভরা চোখে বিছানায় শুয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন।

মন একজন স্বামী হিসেবে চেয়েছিল স্ত্রীর কাছে যেতে কিন্তু একজন লেখক হিসেবে তার লেখার দায়িত্বকে তিনি অবহেলা করতে পারেন না।

তাই লেখক ঝাপসা চোখে আবারো লিখতে বসেন নাটকের বাকি অংশ। দর্শকরা কখনো জানতেও পারেনি অয়োময়ের মত কালোত্তীর্ণ নাটক, যা তাদের কখনো হাসিয়েছিল, কখনো কাঁদিয়েছিল, আবার কখনো ভরে রেখেছিল মুগ্ধতায়, তার পেছনে গুলতেকিনের কতটা ত্যাগ, যন্ত্রণা আর কষ্টের কথা জমা হয়ে আছে।

৩০ বছর ধরে তিনি একটু একটু করে উপরে তুলে ধরেছেন হুমায়ূনকে। নিজের সমস্ত অস্তিত্বকে উৎসর্গ করে নির্মাণ করেছেন হুমায়ূনের পথ। হুমায়ূন যত উপরে উঠেছেন, গুলতেকিন তত নেপথ্যে নিয়ে গেছেন নিজেকে। তারপর এলো যশ-খ্যাতি, প্রতিপত্তি, অর্থ-বিত্ত সব।

যখন কেবল হাত-পা ছড়িয়ে জীবনকে উপভোগ করবার সময়, ঠিক সেই সময়ে কালবৈশাখী ঝড়ের আগমনে তছনছ হয়ে যায় তিলে তিলে গড়া সাজানো সংসার। ২০০৩ সালে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন হুমায়ূন আহমেদ।

এতো ভালোবাসা, এতো ত্যাগ, এতো বিসর্জন- সবকিছু নিমিষেই ভুলে গিয়ে কেউ এভাবে চলে যেতে পারে?! এও সম্ভব এই পৃথিবীতে!

এই অবস্থায় গুলতেকিন একা সংসারের হাল ধরেছেন। ভেঙে পড়েননি, পরাজিত হননি, নতি স্বীকার করেননি। বাবা-মা দুজনের দায়িত্ব একসঙ্গে নিয়ে চার চারজন সন্তানকে মানুষ করেছেন, কারও মুখাপেক্ষী হননি।

হুমায়ূন আহমেদের আগে বাংলা সাহিত্যে এতোটা পাঠক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন কেবল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। গত শতাব্দীর এই সাহিত্যিক একটা কথা বলে গিয়েছিলেন, ❝বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয়।❞ এই কথাটি সত্য হয়েছিলো বর্তমান শতাব্দীর সবচেয়ে পাঠক সমাদৃত কথাসাহিত্যিকের সম্পর্কের বেলায়।

শেষকালে মৃত হুমায়ূন আহমেদকেও শেষ দেখা দেখতে আসেননি গুলতেকিন। দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত দেখতে গিয়েছেন, কিন্তু গুলতেকিন যান নাই। এমন কী, কাকতলীয়ভাবে লাশের সাথে একই বিমানে তাঁর আসার কথা ছিলো। তিনি সেই ফ্লাইট ক্যান্সেল করেন।

কতোটা রাগ, অভিমান, দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, জেদ থাকলে মৃত্যুর পরও তা পুষে রাখতে পারেন একটা মানুষ। শরৎচন্দ্রের সেই কথাটিকে তিনি সত্য প্রমাণ করেছেন।

হুমায়ূনের সাহিত্যিক হিসেবে জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে গুলতেকিনের অবদান অনেক- যা হুমায়ূন নিজেও বিভিন্ন সময় স্বীকার করেছেন। বই উৎসর্গ করতে গিয়ে গুলতেকিন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘জীবনের শ্রেষ্ঠ নারী গুলতেকিন’।

হুমায়ূনের আত্মজীবনী ‘আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই’ বইটিতেও তার লেখক হয়ে ওঠার পেছনে গুলতেকিনের অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন।

আপনি যদি লেখকের ব্যক্তিজীবনের দিকে না তাকিয়ে শুধুই তার সৃষ্টিকর্ম নিয়ে থাকতে চান, তার পরেও এই বিচ্ছেদকে ভালোভাবে নেয়ার সুযোগ আপনার নেই।

হুমায়ূন আহমেদের যত কালজয়ী লেখা, যেই উচ্চমার্গীয় লেখাগুলোর জন্য তিনি “হুমায়ূন আহমেদ”, সেগুলোর প্রায় সবই তার জীবনে গুলতেকিন থাকা অবস্থায়। বলা চলে, গুলতেকিন পরবর্তী জীবনে তিনি শুধুই তার জনপ্রিয়তা বিক্রি করে বইয়ের কাটতি বাড়িয়েছেন। 

গুলতেকিন কোনো যশ-খ্যাতিসম্পন্ন জনপ্রিয় লেখককে বিয়ে করেননি, তিনি বউ হয়ে এসেছিলেন তরুণ সাধারণ এক লেখকের সংগ্রামের সংসারে। তিনি তার স্বামীর লেখক সত্তাকে লালন করেছেন। গুলতেকিন হুমায়ূন আহমেদের জীবনে আবির্ভূত হয়েছিলেন আশার আলো হয়ে।

সেই আলোর জ্যোতি ঠিকরে বেরিয়েছিল তার লেখনীতে। আর তিনি হয়ে উঠেছেন সাহিত্যের সম্রাট।

গুলতেকিন আপাদমস্তক একজন মর্যাদাবান, রুচিশীল, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, দৃঢ়চেতা, সৎ ও সাহসী নারী। প্রতারণা তার চরিত্রকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি একজন আদর্শ সৎ প্রেমিকা ও মমতাময়ী মা।

তিনি যেমন কারো মন ভাঙেননি, তেমনি তিনি কারো জীবন নিয়েও খেলেননি। কারো জীবনকে অভিশপ্ত নয় বরং আলোকিত করেছেন।

বছর বছর সবাই তো হুমায়ূন বন্দনাই করেন, আমি না হয় আজ গুলতেকিন বন্দনা করলাম। নিজের অস্তিত্বকে উৎসর্গ করে, নেপথ্যে থেকে যিনি হুমায়ূনকে অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন, আমি বিশ্বাস করি তিনি চাইলে আরো অনেক উপরে নিজেকে নিয়ে যেতে পারতেন, সেই মেধা, প্রতিভা ও যোগ্যতা- সবই তার ছিলো।

অবশ্য এও আমার বিশ্বাস, আমার মতো অন্য অনেকের হৃদয়েই গুলতেকিন খান আজও শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসার উচ্চ আসনেই বিরাজ করেন, করবেন।

টিকে থাকলে তাদের সম্পর্কটা আজকে ৫০ বছরে পদার্পন করতো। কিন্তু এই সম্পর্কটা টিকেছিলো মোটে বছর তিরিশেক। জীবন টা তো অন্যরকম হলেও হতে পারতো!

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যে অনন্য যে ব্যাপার টা ছিলো, তিনি অন্যদের মতো বড় বড় বাক্য লিখতেন না।

ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করতেন। কয়েক শব্দ পরপরই হুট হাট দাঁড়ি দিয়ে দিতেন। তেমনি একটা দাঁড়ি এসে বসেছিলো তার জীবনের গল্পেও।

কি হতো যদি একটা দাঁড়ি এই সম্পর্কের ওপরেও হুট করে এসে না পড়তো?! জীবনের গল্পটা তো হতেও পারতো যতিচিহ্নবিহীন! জীবন টা তো অন্যরকম হতে পারতো।

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.

Related Articles